
দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরিফ, বা দরবারে সিরিকোট, দ্বীন রক্ষার সংগ্রামে এক সমুজ্জ্বল বাতিঘরের নাম। পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ খাইবার পাখতুন খোয়ার কোহে গঙ্গর, বা গঙ্গর উপত্যকার এক ঐতিহাসিক অন্ঞ্চল’ সিরিকোট’। একে দুর্ধর্ষ শিখদের কবল থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের অধিকারে আনেন ইমাম হোসাইন (রা) ‘র ২২ তম অধস্তন বংশধর হযরত সৈয়্যদ গফুর শাহ্, ওরফে কাপুর শাহ্ (রা), তাই তাঁকে বলা হয় –ফাতেহ্ সিরিকোট, বা সিরিকোট বিজয়ী। তিনি এখানে এসেছিলেন আফগানিস্তানের ‘কোহে সোলায়মানি ‘থেকে, শিখদের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করতে, এবং পথ দেখাতে। বিজয়ের পর তিনি আর স্বদেশে
ফিরে যাননি, বরং এখানেই থেকে যান –যাতে আবাদি এলাকার ইসলাম ও মুসলমানদের পথ প্রদর্শন করতে পারেন। তিনি থাকতেন এ পার্বত্য এলাকার একদম পাহাড়ের মাথায়। সের ‘ মানে মাথা, আর কোহ্’ মানে পাহাড়। সেরকোহ্ ‘ মানে পাহাড়ের মাথা। সিরিকোট বিজয়ীর পবিত্র বাসস্থান বুঝাতে ব্যবহ্রত শব্দ ‘সেরকোহ্ ‘, শব্দ পরিবর্তনের স্বাভাবিক ভাষাতাত্ত্বিক ধারায়, কালক্রমে মানুষের মুখের জড়তায় পরিবর্তন হতে হতে, সেরকোট’ হয় এবং বর্তমানে এসে ‘সিরিকোট ‘ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।* সিরিকোট বিজয়ী এই বীর সৈয়্যদ গফুর শাহ্ (রা) ‘র পূর্বপুরুষরাও ছিলেন এক একজন এক একটা অন্ঞ্চলের বিজয়ী পু্রুষ, ইসলামের বাতিঘর । তাঁর ১২ তম উর্ধ্বতন পুুরুষ হলেন মীর সৈয়্যদ মুহম্মদ গীসুদারাজ (ওফাত ৪২১), তিনি গীসুদারাজ আউয়াল হিসেবেও পরিচিত। (যেহেতু, তাঁর চারশত, পাঁচশত বছর পরে, চিশতিয়া ত্বরিকার কিছু বুজুর্গ একই উপাধিতে পরিচিতি পান। উল্লেখ্য, গীসু মানে চুল, দারাজ মানে দীর্ঘ। লম্বা চুল ওয়ালা বুজুর্গগন কখনো কখনো গীসুদারাজ নামেও অভিহিত হয়েছেন)।মীর সৈয়্যদ মুহম্মদ (গীসুদারাজ আউয়াল) হলেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ‘র ১০ তম, এবং হুজুর পূর নূর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ১২তম অধস্তন বংশধর। এই গীসুদারাজ আফগানিস্তান হতে মুলতান পর্যন্ত বিশাল এলাকার ইসলাম প্রচারক, এবং বীরপুরুষ ছিলেন। তিনি সতের বার ভারত অভিযানকারী সুলতান মাহমুদ গজনবীর (৯৭১ —১০৩০ খ্রি ) বিজয়ের নেপথ্যের আধ্যাত্মিক পুুরুষ হিসেবেও পরিচিত।* আফগানের ‘কোহে সোলায়মানি’ তাঁকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরুপ সুলতান মাহমুদ গজনবীই দান করেছিলেন। গীসুদারাজ আউয়াল এখানে ইসলাম প্রচারক হিসেবেই ইরাকের আউস থেকে এসেছিলেন। এর আগে তাঁর পূর্বপুরুষ সৈয়্যদ জালাল আর রিজাল (রা) সর্বপ্রথম মদীনা পাকের মূল আবাস ছেড়ে আউসে এসেছিলেন। জানা যায়, মদীনা শরিফ ছেড়ে আসা এই দলে ইমাম আযম আবু হানিফা (রা) ‘র প্রধান শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রা)ও ছিলেন। সৈয়্যদ জালাল (রা) ‘র আগমনে
ইরাকের ‘আউস’ ইসলামি শিক্ষা -দীক্ষা ও ঈমান রক্ষার বাতিঘরে রুপ নিয়েছিল।* উল্লেখ্য,সৈয়্যদ জালাল (রা) ‘র দাদা হলেন হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রা)। আর,ইমাম জাফর সাদেক (রা) ‘র দাদা হলেন ইমাম জয়নুল আবেদীন (রা), যিনি হলেন কারবালায় ৬১ হিজরির ১০ মুহরমে বেঁচে যাওয়া, হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ‘র একমাত্র শাহ্জাদা। অর্থাৎ, সিরিকোট বিজয়ী গফুর শাহ্ (রা) এমন এক অদ্বিতীয় বংশধারায় এসেছেন, যাঁদের এই উম্মতের আশ্রয়স্থল “নূহ (আ) ‘র জাহাজ সদৃশ “(হাদিস) বলা হয়েছে। আর, তাঁদের পবিত্রতা ঘোষনা করেন স্বয়ং আল্লাহ্ পাক, কালামে মজিদের মাধ্যমে জানান দিয়েছেন , “হে আহলে বাইতগন! নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্ চাই, তোমাদের মধ্য থেকে সকল অপবিত্রতা দূর করে, তোমাদের পরিপূর্ণ পাক সাফ করে দিতে “(আল আয়াত)। সুতরাং আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছাতেই তাঁরা পবিত্র। আর,ইসলামের ইতিহাস প্রমান করে যে, এ পবিত্র ধারার নেতৃত্বেই আজো সমগ্র বিশ্ব আলোকিত। সর্বশেষ প্রতিশ্রুত যে মহান ইমামের হাতে আবারো বিশ্বে ইসলামের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই মহাকাঙ্খিত ‘হোসাইনি বাতিঘর ‘ ইমাম মাহদী (আ) ও হবেন এ বংশধারা থেকেই। গরীবনওয়াজ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র) বলেছিলেন —“দ্বীন আস্ত হোসাইন, দ্বীন পানাহ্ আস্ত হোসাইন “—-অর্থাৎ, দ্বীনের অপর নামই হল ইমাম হোসাইন, আর দ্বীনের রক্ষকও ইমাম হোসাইন “।উল্লেখ্য, সেই হোসাইনি বংশধারার বিজয়ী পুুরুষ সৈয়্যদ গফুর শাহ্ (রা) ‘রই ১৩ তম অধস্তন পুুরুষ হলেন হযরত সৈয়্যদ সদর শাহ্ (র)। আর, সৈয়্যদ সদর শাহ ‘র সুযোগ্য শাহজাদা হলেন —দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট (শেতালু শরিফ) ‘র প্রতিষ্ঠাতা প্রানপুরুষ, শাহানশাহে সিরিকোট, আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি পেশোয়ারী রহমতুল্লাহ্ আলাইহি (১৮৫৬ —১৯৬১খ্রি)। তিনি পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী বুনিয়াদী তা’লিম -তারবিয়তের পর কোরানে করিমের হিফজ শেষ করেন, এবং এরপর তৎকালিন ভারতের বিভিন্ন দ্বীনি মারকাজ হতে কোরান -হাদিস -ফেকাহ্ সহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞানার্জন করেন। ১২৯৭ হিজরির শা’বান মাসে (১৮৮০ খ্রি) তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বশেষ সনদ লাভ করেন।*
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সফর রত হযরত পীর সাবির শাহ্ (মাজিআ) হলেন হযরত শাহানশাহে সিরিকোট (র)’র ছোট নাতি, এবং ইমাম হোসাইন (রা)’র ৩৭ তম অধস্তন বংশধর।
এডভোকেট মোসাহেব উদ্দীন বকতিয়ার
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক;ইসলামি চিন্তান্বিত।