
আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে, বেড়েছে শিক্ষার হার। দিন দিন মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু কেন জানি শিক্ষার সুফল যেন সমাজ পাচ্ছে না।
সামাজিক সভ্যতা যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু হারাচ্ছে আমাদের মানবিকতা। ফলে ক্রমশই বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, বাড়ছে অশ্লীলতা, নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কগুলো, সমাজ হয়ে উঠছে অস্থির। মানব সমাজে পচন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে এর বহি:প্রকাশ ঘটছে। অন্যদিকে দেশ থেমে নেই, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, প্রযুক্তি, সভ্যতা, উন্নয়ন সবকিছুই এগিয়ে চলছে। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন লক্ষ্যহারা হয়ে পড়েছে, যেন পথহারা পথিকের ন্যায় কোথাও ঐক্য ও সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সমাজও নানা সামাজিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মানব সমাজের সার্বিক পরিবেশকে দুটি অংশে পৃথক করা যায়। একটি “সামাজিক পরিবেশ” আর অন্যটি “প্রাকৃতিক পরিবেশ”। এদুটোর একটিও আর সুস্থ ও স্বাভাবিক নেই, হয়ে পড়েছে ভারসাম্যহীন। যদিও বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবাদী মহল থেকে এ ব্যাপারে বার বার সতর্ক সংকেত দেয়া হচ্ছে।
একদিকে সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার ফলে অযাচিত সংঘর্ষ, হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি,দখলবাজি, লুটতরাজ ইত্যাদি ব্যাধি সামাজিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা, খরা ইত্যাদি সময়ে-অসময়ে অস্বাভাবিকভাবে মহাবিপর্যয় ডেকে আনছে, প্রকৃতি হয়ে উঠছে লাগামহীন ও চরম খেয়ালী। এখন, প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, আমাদের কোন আদর্শের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে !
তবে এসবের অনেক বিষয়ে কিছু সমাধানও দেয়া হচ্ছে, নতুন নতুন আইন হচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক তত্ত্ব আসছে, কিন্তু সুস্থ ধারার সামাজিক পরিবেশ বিরাজ করছে না। বরং দিনে দিনে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি, ফলে আত্মহত্যা ও হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলছে। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সামাজিক সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল জায়গাগুলোতে ফাটল ধরছে, ঢুকে পড়ছে অবিশ্বাস। ফলে সমাজ ছাড়া হচ্ছে সুখ-শান্তি।
সবচেয়ে বেশি অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে যুব সমাজ, যারা দেশের আগামির ভবিষ্যৎ। তারা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে, হয়ে যাচ্ছে বখাটে, মদ্যপ, ধর্ষক ও সন্ত্রাসী। আর যারাও বা শিক্ষিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে বেশীরভাগই লোভ-লালসার মানসিকতার কারণে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয়-সামাজিক মূল্যবোধগুলো রক্ষা করে চলতে পারছে না, একপর্যায়ে বনে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ, সুদখোর ও ঘুষখোর। ফলে সমাজ ছাড়া হচ্ছে ন্যায়নীতি ও ন্যায়-বিচার। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে অশনিসংকেত।
আর দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত নাগরিক হয়েও অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ যেন তাতে গা এলিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে যে সামাজিক অস্থিরতাসমূহ প্রকট হয়ে দেখা দিবে এবং দেশের জন্য তা মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে সেই দিকে কারোরই খেয়াল নেই। কেননা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোই এসব অস্থিরতা সামাল দিতে এখন ব্যর্থ হচ্ছে। মানব সমাজের প্রায় সকল ক্ষেত্রে এ অস্থিরতাসমূহের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
এখন আমাদের উচিত হবে উন্নত বিশ্বের ভাল-মন্দ দিকসমূহ বিবেচনা করে সচেতন পদক্ষেপে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। অন্ধ অনুকরণ নয়। কাজেই এসব মানবিক বিপর্যয় ও অস্থিরতা রোধে আমাদের আশু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
স্বেচ্ছায় ও সানন্দে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ পালনের উৎসাহ ও নিদের্শনা মানুষ ধর্ম থেকে পেতে পারে। আজ মানুষের প্রয়োজনেই মানুষকে আবার মানবিকতার চর্চা করতে হবে, আর সুস্থ ধারার সমাজ গড়তে লালন করতে হবে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো। কেননা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ ধারায় বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ও বখে যাওয়া রোধ করতে হবে, এর বিকল্প নেই।